বাংলাদেশে ই-কমার্সের প্রসার দিন দিন বাড়ছে এবং অনেক উদ্যোক্তা অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে অভাবনীয় সফলতা পাচ্ছেন। অনলাইন ব্যবসা দেশের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বড় কোন প্রস্তুতি বা পুঁজি ছাড়াই প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও উদ্যোক্তা হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখছে। তাই অনলাইনে পণ্য বিক্রি এখন শুধু একটি ট্রেন্ড নয়, এটি একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল। অনলাইনে পণ্য বিক্রির কৌশল জানা থাকলে ব্যবসায় মুনাফাও বাড়বে, ব্যবসা টেকসইও হবে। তাই আজ আমরা আলোচনা করবো অনলাইনে পণ্য বিক্রির কৌশল নিয়ে, যা আপনার ব্যবসায়িক সাফল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এর আগে আমি ‘বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসা শুরুর প্রস্তুতি নেবেন কীভাবে?’, এই বিষয়ের উপর একটি ব্লগ লিখেছি। আজ তারই ধারাবাহিকতায় জেনে আসি অনলাইনে পণ্য বিক্রির ৭টি কৌশল এবং এই কৌশলগুলো প্রয়োগ করে কীভাবে ব্যবসার লাভ বৃদ্ধি করা যায়?
ব্লগে যা থাকছে-
১. সঠিক পণ্য নির্বাচন করুন
বিক্রির জন্য আপনার কাছে অনেক ধরনের পণ্য থাকতে পারে, কিন্তু সকল পণ্য অনলাইন বেচাকেনার জন্য নয়! তাই অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো সঠিক পণ্য নির্বাচন। আপনি কী কী পণ্য বিক্রি করবেন, তা নির্ধারণ করা আপনার ব্যবসার প্রাথমিক ভিত্তি। বাংলাদেশে অনলাইনে ব্যবসা করার জন্য এমন পণ্য নির্বাচন করুন যা স্থানীয় কাস্টমারদের চাহিদা পূরণ করে। যে পণ্যগুলো আপনার এলাকার বাজারে সহজে পাওয়া যায়, কিন্তু অন্য এলাকায় পাওয়া কঠিন। যেমন- হ্যান্ডমেড বিভিন্ন প্রোডাক্ট, পোশাক সহ ফ্যাশন আইটেম, বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের চাহিদা এখানে বেশি।
আমার পরিচিত একজন উদ্যোক্তা ঢাকায় থাকেন। তিনি শুরুতে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। পরে তিনি তার নিজের এলাকায় পাওয়া যায় এমন দুটি পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। ঢেঁকিছাঁটা চিড়া এবং ঢেঁকিছাঁটা লাল চাল, এই দুটি পণ্য নিয়ে এখন তার সফল অনলাইন ব্যবসা। মুনাফা বেড়েছে বহুগুণ এবং দেশের বাহিরেও তার পণ্যের চাহিদা বাড়ছে!
২. সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন করুন
বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বিক্রির কৌশল গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি হলো, সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন করা। বাংলাদেশে বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেমন- দারাজ ডট কম, সহজ ডট কম, ফুডপান্ডা ডট কম, আলিবাবা ডট কম, লালসবুজ ডট কম, অথবা ডট কম, চালডাল ডট কম, পিকাবো ডট কম ইত্যাদি। এছাড়াও আপনি নিজের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ থেকেও পণ্য বিক্রি করতে পারেন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন করলে আপনার পণ্য সঠিক গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। কিছু উদাহরণ দেই-
- যদি আপনি ফ্যাশন পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে দারাজ ডট কম এর মতো প্ল্যাটফর্মে আপনার পণ্য তোলা ভালো। কারণ এগুলোতে ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা বেশি।
- আপনি যদি ইলেকট্রনিক পণ্য বা গেজেট নিয়ে ব্যবসা করতে চান তাহলে পিকাবো ডট কম ভালো।
- আবার আপনার পণ্য যদি হয় ফুড বা খাবার সংক্রান্তু, তাহলে ফুডপান্ডা এবং চালডাল ইত্যাদি ভালো।
৩. মানসম্মত পণ্য এবং আকর্ষণীয় পণ্যের বিবরণ ও ছবি যোগ করুন
অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে মানসম্মত পণ্যের পাশাপাশি পণ্যের চমৎকার বিবরণ এবং ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহুতু আপনার গ্রাহকরা পণ্য সরাসরি দেখতে বা স্পর্শ করতে পারেন না, তাই পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি এবং বিস্তারিত বিবরণ তাদেরকে কেনার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
কীভাবে করবেন?
- পণ্যের সেরা ছবি প্রদর্শন করুন: ভালো রেজ্যুলেশনের বিভিন্ন দিক থেকে (মাল্টিপল অ্যাঙ্গেল) থেকে তোলা ছবি যুক্ত করুন। মনে রাখবেন- প্রথমে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি!
- ভিডিও রিভিউ দিন: কাস্টমারদের জন্য ছোট ভিডিও তৈরি করে পণ্যের সুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করুন। আপনি নিজেই ভিডিও রিভিউ দিন, এটা কাস্টমারদের বিশ্বাস স্থাপনে সহায়তা করবে।
- পণ্যের ডিটেইলড বর্ণনা: পণ্যের বৈশিষ্ট্য, উপকারিতা এবং ব্যবহারের নিয়ম পরিষ্কারভাবে লিখুন। এটা না করলে আপনার সাইটে শুধু পণ্য দেখে, কাস্টমার অন্য সাইট থেকে কিনবে!
- সাধারণ জিজ্ঞাসা: গ্রাহকদের সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে থেকেই দিন।
আপনি যদি পেশাদার ফটোগ্রাফার দিয়ে পণ্যের ছবি তোলান এবং প্রতিটি পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ যোগ করেন তাহলে আপনার পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল মার্কেটিংকে কাজে লাগান
সোশ্যাল মিডিয়া হলো অনলাইনে পণ্য বিক্রির সবচেয়ে শক্তিশালী টুল। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে আপনি সহজেই আপনার পণ্যের প্রচার করতে পারেন। নিয়মিত পোস্ট শেয়ার করুন, গ্রাহকদের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করুন এবং তাদের ফিডব্যাক নিন।
কীভাবে করবেন?
- ফেসবুক এডস ব্যবহার করে টার্গেট অডিয়েন্সকে নির্দিষ্ট করুন। এরপর সুনির্দিষ্ট কাস্টমার ধরে টার্গেটেড এডভার্টাইজমেন্ট চালান।
- নিয়মিত পোস্ট করুন এবং স্টোরিজ শেয়ার করুন।
- ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং করতে পারেন।
ডিজিটাল মার্কেটিং করুন
প্রোডাক্ট মার্কেটিং ছাড়া অনলাইন বিক্রি বাড়ানো কঠিন। কিছু কার্যকর ডিজিটাল মার্কেটিং করুন-
- SEO অপটিমাইজেশন: আপনার ওয়েবসাইট এবং পণ্যের বিবরণ SEO বান্ধব করুন যাতে গুগল সার্চে সহজেই আসে।
- ইমেইল মার্কেটিং: পুরাতন ও নতুন কাস্টমারদের ইমেইল পাঠিয়ে অফার দিন। তাদের আপ-টু-ডেট রাখুন।
৫. ডিসকাউন্ট ও অফার দিয়ে কাস্টমারদের খুশি রাখুন
ডিসকাউন্ট এবং অফার গ্রাহকদের আকর্ষণ করার একটি কার্যকরী উপায়। বিশেষ উৎসব, ছুটির দিন বা সিজনাল অফার এর মাধ্যমে আপনি গ্রাহকদের বেশি বেশি ক্রয়ে উৎসাহিত করতে পারেন। গ্রাহকরা সবসময় ডিসকাউন্ট এবং অফার পছন্দ করেন।
কীভাবে করবেন?
- বিশেষ উৎসব বা ছুটির দিনে ডিসকাউন্ট অফার করুন।
- লয়্যাল্টি প্রোগ্রাম চালু করুন।
- বান্ডেল অফার বা বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি অফার দিন।
- লিমিটেড টাইম ডিসকাউন্ট চালু করুন।
- বিনামূল্যে ডেলিভারি অফার করুন নির্দিষ্ট অর্ডারের উপরে।
৬. গ্রাহক সেবায় বিশেষভাবে মনোযোগ দিন
অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহক সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহকদের প্রশ্নের দ্রুত উত্তর দিন, তাদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করুন এবং তাদের ফিডব্যাক গুরুত্বের সাথে নিন। ভালো গ্রাহক সেবা আপনার ব্যবসার সুনাম বাড়াবে। কাস্টমাররা পুনরায় আপনার কাছ থেকে পণ্য কিনবেন এবং অন্যদেরকেও আপনার স্টোরের কথা বলবেন।
কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন-
- দ্রুত গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিন।
- পণ্য ডেলিভারির সময়সীমা মেনে চলুন।
- একাধিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করুন।
- কাস্টমারকে ট্র্যাকিং নম্বর দিন।
- ডেলিভারি সময় কমানোর চেষ্টা করুন।
- গ্রাহকদের ফিডব্যাক নিন এবং তা মানোন্নয়নের জন্য কাজে লাগান।
- সন্তুষ্ট গ্রাহকদের রিভিউ দিতে উৎসাহিত করুন।
- নেতিবাচক রিভিউ এড়ানোর পরিবর্তে সমস্যার সমাধান করুন।
- ভালো রিভিউগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করুন।
৭. লেনদেনের হিসাব রাখুন এবং পেমেন্ট অপশন সহজ করুন
অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে পেমেন্ট অপশন সহজ এবং নিরাপদ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখনও অনেক গ্রাহক ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) পছন্দ করেন, তবে অন্যান্য পেমেন্ট অপশন যেমন- মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড, এবং ডেবিট কার্ডও ব্যবহার করা উচিত। সহজ কথায়, পেমেন্ট প্রসেস সহজ এবং নিরাপদ রাখুন।
হিসাবপাতি-এর মতো একটি অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে লেনদেনের সকল হিসাব ডিজিটালি রাখুন।
- পণ্য বিক্রির হিসাব রাখুন।
- স্টক ম্যানেজ করুন।
- মুনাফা ও ব্যয়ের হিসাব ট্র্যাকিং করুন।
- প্রতিটি লেনদেনের ইনভয়েস প্রদান করুন।
- বাকি বকেয়ার হিসাব রাখুন।
- স্টক সামারি সহ বিভিন্ন রিপোর্ট বিশ্লেষণ করুন।
অনলাইনে পণ্য বিক্রির কৌশল জানা এবং তা সঠিকভাবে প্রয়োগই হতে পারে আপনার ব্যবসায়িক সাফল্যের চাবিকাঠি। সঠিক পণ্য নির্বাচন, আকর্ষণীয় পণ্যের ছবি ও বর্ণনা, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার, গ্রাহক সেবা, ডিসকাউন্ট অফার, সুবিধাজনক পেমেন্ট সিস্টেম এবং হিসাবরক্ষণ অ্যাপের ব্যবহার করে আপনি আপনার অনলাইন ব্যবসাকে আরও লাভজনক করতে পারেন। অনলাইনে পণ্য বিক্রির কৌশল শুধু আপনার বিক্রি বাড়াবে না, আপনার ব্র্যান্ডের সুনামও বাড়াবে। আপনার ব্যবসার সার্বিক সাফল্য কামনা করছি!
ডেমো দেখে সহজ তিনটি ধাপে হিসাবপাতি’তে যাত্রা শুরু করুন!
- ১ম ধাপ- হিসবাপাতি’তে সাইন আপ করুন:
প্রথমেই হিসাবপাতি’র ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার ব্যবসার জন্য একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। অথবা ব্যবসা পরিচালনাকে সহজ করতে আজই ফ্রিতে ডাউনলোড করে ইন্সটল করুন- ‘হিসাবপাতি’
এরপরেই রেজিস্ট্রেশন করে ফেলুন। হিসাবপাতি’তে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া খুবই সহজ এবং এটি সম্পূর্ণ ফ্রি!
- ২য় ধাপ- আপনার কোম্পানি সেট-আপ করুন:
সাইন আপ করে প্রথমেই মালিক হিসেবে আপনার কোম্পানির প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ব্যবসার প্রোফাইল সেট-আপ করুন। তারপর ইনভেনটরি থেকে শুরু করে ইউনিট, ক্রয়-বিক্রয়, বাকি বকেয়া, ইনভয়েস এবং লেনদেন সহ ব্যবসার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সেট-আপ করুন। এরপর শুরু করুন প্রতিদিনের লেনদেন আপডেট রাখার কাজ।
- ৩য় ধাপ- হিসাবপাতি’র বিভিন্ন ফিচার উপভোগ করুন:
হিসাবপাতি’তে ব্যবসার হিসাব রাখা শুরু করার পরে, প্রয়োজনীয় এবং ইউনিক ফিচারগুলো ব্যবহার করতে থাকুন। যেমন- ইনভয়েস, বারকোড স্ক্যানার, ইউনিট, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। হিসাবপাতি’র ব্যবহারবিধি ও ফিচারের বিস্তারিত বুঝতে ইউটিউবে বাংলায় ডেমো ভিডিও দেখুন।
জমা খরচের ডিজিটাল খাতা- হিসাবপাতি’র ডেমো
হিসাবপাতি সহজ ও সাশ্রয়ী হিসাবরক্ষণ অ্যাপ। এর সাবস্ক্রিপশন ফি বিভিন্ন মেয়াদে এবং সুলভ প্যাকেজে ভাগ করে নির্ধারণ করা হয়েছে। হিসাবপাতি’র সকল প্যাকেজের মূল্য ও ফিচার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আজই বেছে নিন আপনার পছন্দের প্যাকেজটি! আপনার ব্যবসার জন্য শুভকামনা!
